জীবের ভালোবাসা। মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ - কুঁড়েঘর
জীবের ভালোবাসা
মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ
বাদাপাড়ার তৈমুজ হাজী ওরফে বাদশা মিয়া উন্মুক্ত পৃথিবীর নিচে বটতলা বাজারের বড় পাকা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাচ্চা শিশুর ন্যায় ফ্যাল ফ্যাল করে কাঁদছিল।তার এই ফ্যাল ফ্যাল করে কাঁদার পিছনে একটা ইতিহাস আছে।দীর্ঘ এক কাহিনীও বলা যায় তাকে।
একটু ভেবে দেখলে সে ইতিহাস বৃদ্ধ বয়সে এই ফ্যাল ফ্যাল করে
শিশুর ন্যায় কাঁদার কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।নইলে উন্মুক্ত পৃথিবীর নিচে এমন করে
বাদশা মিয়া কাঁদবে কেন?
বাদশা মিয়া মেম্বার পদে নির্বাচন করে জনগনের সেবার জন্য হাজার
হাজার টাকা খুইয়েছে।বিলিয়ে দিয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা,স্কুল, কলেজ নানা সংগঠনের জন্য
হাজার হাজার টাকা।কিন্তু গ্রামের জনগনের ভালোবাসার বিন্দু মাত্র আলোড়ন তুলতে
পারেনি।ভালোবাসার কোন বিশেষ প্রভাব জনগণের মনে ফেলেনি।
তখনকার কথা হয়তো এখন নিছক কাহিনীর মতোই শুনাবে।জনগণের ভালোবাসা
অর্জনে ব্যর্থ হয়ে বাদশা মিয়া
অন্য দিকে মন ঘুরিয়ে নেয়। জীব- জন্তুর ভালোবাসা অর্জন করবে।তাদেরকে আদর যত্ন দিয়ে আপন করে নিবে।হয়তো মানুষের মতো পশুরা বেইমানী করবে না।
অন্য দিকে মন ঘুরিয়ে নেয়। জীব- জন্তুর ভালোবাসা অর্জন করবে।তাদেরকে আদর যত্ন দিয়ে আপন করে নিবে।হয়তো মানুষের মতো পশুরা বেইমানী করবে না।
এটা তার হাজার বার বিশ্বাস আছে।
আর সেই বিশ্বাস থেকে সরুজদির হাটে যায় বাদশা মিয়া।
এবার সে একটি ছাগল কিনবে।
বড় ছেলে ইউনুস বাঁধা।আবাদ ফসল ভালো হয় নাই, বাবা আগামী বছর
ছাগল কিনলে ভালো হবে। না ,বাদশা মিয়া কিনবেই।
--- ছেলে ইউনুস এও বলে,বাবা আগামী বছর না হয় মোটাতাজা দেখে
একটি গরু কিনলে হয় না?এখন তো দাম চড়া।তাছাড়া বাবা টাকা কোথায় পাবা?
টাকা কোথা থেকে আসবে তা বাদশা মিয়া জানে না।তবু ছাগল তার চাই, চাই- ই।
টাকা কোথা থেকে আসবে তা বাদশা মিয়া জানে না।তবু ছাগল তার চাই, চাই- ই।
অবশেষে বাদশা মিয়ার জিদই বহাল থাকলো।
টাকা যোগাড় হয়ে গেলো।
যাক,বাদশা মিয়া সুরুজদির হাটে।বেছে বেছে মনের মতো একটি ছাগল
কিনবে।
হয় দুধের মতো সাদা,নয়তো চিক চিক কালো।
সুরুজদির হাটে প্রবেশ করেই বাদশা মিয়া অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো।
---- হ- হ ।এ - যে- ওরে বাপরে!
এ- যে হাজার হাজার রে বাবা!
হাজার হাজার না হলেও ছাগল গরু দু- ই মিলে হাজার খানেক আমদানী
সুরুজদির হাটে হয়।
আর মানুষও তেমনি হারে বাজারে এসেছে।ছাগল গরুর চিৎকার ও মানুষের
কলরবে সে অদ্ভুত কোলাহল ধ্বনিত হচ্ছে।ছাগল গরুর বাজার এমনই।
সূর্য তখন মাথার উপর।
সূর্য তখন মাথার উপর।
যেখানটায় ছাগল গরু বেচা কেনা হচ্ছে সেখানে একবিন্দু ছায়া কোথাও
নেই। তবু মানুষের সেদিকে খেয়াল নেই।তারা অক্লান্ত ভাবে ভালো ছাগল গরুর জন্য ঘুরছে।
বাদশা মিয়া সে ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়।আপন মনে, মনের মতো পশু সন্ধান করছিলো।সুন্দর
এক কালো চিক চিকে ছাগল মিলে গেলো।এটাই কিনবে।
গেরস্তকে ছাগলের দাম মিটিয়ে দিয়ে বাদশা মিয়া ছাগল নিয়ে বাড়ির
দিকে পা বাড়ালো।কিছুদূর আসার পর ছাগলের গলার রশি খুলে দিলো।
আশ্চার্য!
ছাগল পালানো বাদ দিয়ে বাদশা মিয়ার পিছু পিছু রওয়ানা দিলো।
ছাগল পালানো বাদ দিয়ে বাদশা মিয়ার পিছু পিছু রওয়ানা দিলো।
বাদশা মিয়া সামনের দিকে হাটে ছাগল তার পিছু পিছু হাটে।
অবাক জনগণ!
এ কোন যাদু? সদ্য কেনা ছাগল গলার রশি খুলে দিয়েছে তবু ছাগল
পালায় না।
পাড়া গাঁয়ের জনগণ যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে তাকিয়ে এদৃশ্য
দেখে।বাড়ি পর্যন্ত বাদশা মিয়া ছাগল নিয়ে পোঁছে।ব্ড়ির লোকজনও অবাক!
স্নেহভরে ছাগলটিকে বাদশা মিয়া বেশ কয়েক দিনেই আপন করে নেয়।সব
সময় ছাগলটি তার পিছু নিয়েই থাকে।
বাদশা মিয়া ডেখানে যায়, ছাগলটিও সেখানে যায়।
এমন ঘনিষ্ঠ ভালোবাসার সৃষ্টি হলো যা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
দেখতে দেখতে কুরবাণীর ঈদ এলো।
বাদশা মিয়া তো ধনী মানুষ। কুরবাণী তাকে তো দিতেই হবে!আল্লাহ তো
কুরবাণীর জন্য প্রিয় জিনিস পছন্দ করে।
বাদশা মিয়া সিদ্ধান্ত নেয় তার প্রিয় জিনিস তো ঐ ছাগলটি। ঈদে ঐ
ছাগলটিই কুরবাণী দিবে।যত্ন সহকারে পালন করে ছাগলটি হৃষ্ট পুষ্ট হয়েছে।
কিন্তু,
এ ছাগলটি কেমনে কুরবাণী দিবে?
তার প্রতি তো তার প্রচন্ড ভালোবাসা।
জিলহজ্জের ১০ম দিন।
ঈদগাহ থেকে ফিরে ছাগলটিকে ডাকলো।
---আয় বাবা,আয়।
---- আয় তোকে আল্লাহর রাস্তায় কুরবাণী দেয়ার মনন্থ করেছি।অমনি
ছাগলটি কাছে আসলো।
---- আবু বকর মুন্সিকে ডাকে বাদশা মিয়া।ছুরি নিয়ে আসো।
--- ছুরি নিয়ে আসলো।ছাগলটি বাদশা মিয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে
আছে।পা নড়াচরা নেই।
--- বাদশা মিয়া ছাগলটিকে বলে,বাবা শুয়ে পড়।মুন্সি ছুরি নিয়ে
অপেক্ষা করছে।অমনি ছাগলটি শুয়ে পড়ে।তাকে ধরার জন্য কোন লোকের প্রয়োজন হয় না।মুন্সি
ছাগলটির গলায় যখন ছুরি চালায় তখনও ছাগলটি বাদশা মিয়ার দিকে তাকিয়েই আছে।
যাক,
এর কিছুদিন পর বাদশা মিয়া মোষ কেনার জন্য নঈম মিয়ার হাটে যায়।
ভালো গড়ন দেখে একটা মোষ কিনবে।
ভালো গড়নের একটা মোষ কিনেও ফেলে।
মোষ বাড়ি আনে।
খড়ের টিবির পাশে ছেড়ে দেয়।মোষ আনন্দ খড় খেতে থাকে।বাদশা মিয়া
পাশে দাঁড়ায় থাকে।আড়াল হলে মোষ খাওয়া বন্ধ করে দেয়।পিছন ফিরে বাদশা মিয়াকে খুঁজতে
থাকে।আবার বাদশা মিয়া যেখানেই যায় মোষও পিছু পিছু ডায়।
অবাক হয়ে যায় বাদশা মিয়া।
এ আবার কেমন মোষ? মহা মুশকিল!মাঠের কাজে গেলে মোষও যায়।ঘরে
গেলে মোষও ঘরে যায়। এখবর গ্রামের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
মানুষ মোষ দেখার জন্য বাদশা মিয়ার বাড়িতে ভিড় করে।নানা গ্রাম থেকে খবর আসে বাদশা মিয়ার কাছে।
--- মোষ নিয়ে আসেন? এক নজর দেখি।
---বাদশা মিয়া মোষ নিয়ে যায় এলাকায়।
গ্রামের জামে মসজিদের পাশে বসা ম্যালেটারী,আব্দুস সালাম আরো
অনেকে।বাদশা মিয়া মাঝখানে গিয়ে বসে। মোষটাও তার হাটুর উপর মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকে।
অবাক লোকজন!
আরেকদিন যায় তারাকান্দি এক আত্মীয়ের বাড়ি।মোষও যায় সঙ্গে।
আত্মীয় বাড়ি যেতে পথে বাঁশের সাঁকো।
বাদশা মিয়ার বয়স সত্তরের কাছাকাছি। জোয়ান বয়সের শরীর তো আর
নেই। হাটতেই পড়ে যাবার উপক্রম।
কিন্তু এ সাঁকো?
কিভাবে পাড় হবে?
বাদশা মিয়া সাহস করে সাঁকোতে উঠে পড়ে।আস্তে আস্তে চলতে
থাকে।শরীরের ভাড়ে সাঁকো নড়ে উঠে।এদিকে মোষ পানিতে নামে।মাথা উঁচু করে খাল পাড়
হয়।ডাঙায় উঠে মোষ পিছন ফিরে তাকায়।তখনও বাদশা মিয়া সাঁকোর উপর দিয়ে কেঁপে কেঁপে
বাঁশের উপর পা ফেলছে।মোষ আবার সাতরিয়ে বাদশা মিয়ার কাছে আসে।যতক্ষণ সাঁকো থেকে
ডাঙায় পা না রাখে, মোষ খাল থেকে ডাঙায় উঠেনি।এমন ভালোবাসা মোষের জন্মেছে বাদশার
প্রতি।বাদশা মিয়া মোষের নাম রেখেছে " হাসনা" ।হাসনা বলে ডাক ছাড়লেই মাথা
উঁচু করে মোষ বাদশার কাছে ছুটে আসে।
আরেকদিন যায়, বরুডুবি ও গোল্লার পাড়।
সারাদিন মোষ নিয়ে ঘুরে ফিরে বেলা তিনটায় বাড়ি রওয়ানা দেয়।বটতলা বাজারে নুরুল আমিনের চা স্টলের কাছে পৌঁছে চা স্টলে ঢুকে। মোষ একটু পিছনে ছিলো।তাই বাদশা মিয়া কোথায় ঢুকলো তা বুঝতে পারে না।ছুটাছুটি করতে থাকে। এমন সময় একটি বাস এসে মোষের গায়ে ধাক্কা দেয়। ধাক্কা খেয়ে মোষ মাটিতে পড়ে যায়।পা ভেঙ্গে যায়। দৌড়ে চা স্টল থেকে বাদশা মিয়া বের হয়ে আসে। মোষ কে ধরে দাঁড় করানো চেষ্টা করা হয়। কোন কাজ হয় না।বাদশা মিয়া উপায়ন্ত না দেখে পাকা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েই বাচ্চা শিশুর ন্যায় ফ্যাল ফ্যাল করে কাঁদতে শুরু করে।দীর্ঘক্ষণ শুধুকেঁদেই চলে।
গল্পটি লেখক কিংবা কুঁড়েঘর সাময়িকী পরিবারর অনুমতি ব্যাতিত কপি করা নিষেধ৷

No comments