কষ্টের ফেরিওয়ালা । আজহার মাহমুদ - কুঁড়েঘর
কষ্টের ফেরিওয়ালা
আজহার মাহমুদ
আমাদের
প্রত্যেকের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে সুখ, কষ্ট, আনন্দ, বেদনা, ব্যথা, বিরহ,
হাসি, কান্না আরো অনেক কিছুই। প্রত্যেকের জীবন এসব কিছু নিয়েই গঠিত। তবে এমন
কিছু জীবন রয়েছে, যেখানে কিছু কিছু বিষয় কখনো উপস্থিত হয়না। সেসব বিষয় গুলো
একত্রিত করলে যা বুঝায় তা হলো সুখ। সুখ ব্যতীত জীবন মানেই নিঃসন্দেহে কষ্ট আর
দুখ। আর তেমনি একটি জীবন নিয়ে ঘুরছে মানিক নামের এক কষ্টের
ফেরিওয়ালা। নাম তার মানিক হলেও লোকে থাকেকষ্টের ফেরিওয়ালা বলেই চিনে ।
সে কষ্টটা খুব ভালো করেই নিজের কাছে রাখতে জানে। এইতো সেদিন তার পরিবারের
সকলে তাঁকে চরম অমানুষিক ভাবে নির্যাতন করেছে। বড় ভাই পিছন থেকে ধরে ছিলো,
আর সামনে থেকে তার ছোট ভাই এবং তার মা তাঁকে প্রচন্ড ভাবে নিপীড়ন করছে। ভাবতে অবাক
লাগে মা কীভাবে সন্তানকে নির্যাতন করবে? ভাই কীভাবে ভাই কে নিপীড়ন করবে? না। আসলে
এগুলো তার আপন কেউ না। খুব ছোট বেলায় মানিক তার মাকে হারিয়ে ফেলে। তখন তার
বয়স মাত্র সাত বছর ছিলো। আর বাবা? সে তো থেকেও নেই। আসলে এগুলো সবাই তার
সৎ। মানিক সৎ না ভাবলেও তারা তাকে এক মুহূর্তের জন্যও সহ্য করতে পারে না।
কখনো আপন ভাবে না এই এতিম ছেলেটাকে। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত সে কখনো ঠিক
মতো খেতে, ঘুমোতে এমনকি পড়তেও পারেনি। কখনো খেতে দেয় না, কখনো ঘুমাতে দেয় না, কখনো
পড়তে দেয় না এভাবেই দিন কাটাতে থাকে এই কষ্টের ফেরিওয়ালা। আজ তার বয়স ১৮ বছর।
এখনো সে আগের মতোই রয়ে গেলো তার পরিবারের কাছে। যেন একটি কাজের ছেলে। খুব করুণময়
একটি জীবন তার। এখোনো রোজ কয়েকবার সহ্য করতে হয় তার পরিবারের অত্যাচার। তবুও
যেনো তার কাছে পৃথিবীতে আরো কিছু কষ্ট নেওয়া বাকি আছে। সে এসব কষ্ট গুলো
খুব সহজেই তার কাছে থাকা সুখ দিয়ে রোজ কিনে নেয়। সে রোজ কোনো না কোনো অজুহাতে মার
খাবে তার পরিবারের কারো না কারো হাতে। পরিবার কথাটি সবার কাছে সহজ হলেও মানিকের
কাছে এটা একটা নরকের মতো মনে হয়। যেখানে সে রোজ ফ্রিতে অনেক অনেক কষ্ট উপহার
পায়। তার এই কষ্ট গুলো সে কিন্তু সহজেই ভুলতে পারে না। তাই খুব যত্ন করে
সে এই কষ্ট নিজের কাছে রেখে দেয়। তবে বড় অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে এই কষ্টকর
জীবনের ভেতরও মানিকের চোখে কখনো একফোঁটা জল দেখা যায় না। তার কষ্ট গুলো
সে খুব সহজ ভাবে নিতে শিখেছে আজ। আজ সে অন্যের কষ্ট গুলোও নিজের কাধে
নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাইতো লোকে তাকে আজ কষ্টের ফেরিওয়ালা বলে ডাকে। মানিক
এতো কষ্টের ভেতরও তার ঘর, পরিবার ছেড়ে যাই নি। অনেক চেষ্টা করেছিলো
পরিবারের সবাই তাকে তাড়াতে। কিন্তু পারে নি। ভাবছেন সম্পত্তির লোভে? না। সম্পত্তির
লোভে নয়, দু বেলা খাওয়ার জন্যও নয়। হ্যাঁ তবে সে কখনোই যাবেনা তার ঘর এবং পরিবার
ছেড়ে। কারণ মানিক কখনো তার মায়ের স্মৃতি ফেলে চলে যেতে পারে না। সে রোজ মায়ের সাথে
কথা বলে। তার কষ্টের হিসেব গুলো যে তার মাকে দিতে হয়। সে রোজ কষ্ট গুলো
নিয়ে নিজের হৃদয়ের থলিতে জমিয়ে রাখে। আর রাত হলে মাকে সব কষ্ট গুলোর
হিসেব দেয়। এভাবেই চলে যায় মানিকের এক একটি রাত । আর জমাতে থাকে তার কষ্টগুলো।
এভাবে জমানো কষ্ট গুলো নিয়ে একদিন না ফেরার দেশে চলে যাবে এই কষ্টের
ফেরিওয়ালা। শেষ হয়ে যাবে একটি কষ্টের ফেরিওয়ালার গল্প। তবে
শেষ হবেনা তার কষ্ট। থেকে যাবে সেসব মানুষের হৃদয়ে যারা তার কাধে রোজ কাষ্টের
বোঝা চাপিয়ে দিতো।
গল্পটি লেখক কিংবা কুঁড়েঘর সাময়িকী পরিবারর অনুমতি ব্যাতিত কপি করা নিষেধ৷

No comments